গতি নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতি সহায়তা বাস্তবায়নে

ব্যাংকার-গ্রাহক উভয় পক্ষেই আছে অস্পষ্টতা ও অস্বস্তি

বন্ধ কারখানা চালুসহ দেশের অর্থনীতির স্থবিরতা কাটাতে প্রায় আড়াই মাস আগে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

১৫টি খাতে বিভক্ত এসব প্যাকেজ বাস্তবায়নের নীতিমালা এরই মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের গতি ধীর বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।

কেবল প্রণোদনা প্যাকেজই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যেসব নীতিসহায়তার ঘোষণা এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের গতিও ধীর। এর মধ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে যে বিশেষ পুনঃতফসিল ও এক্সিট সুবিধা দেয়া হয়েছে, সেটির বাস্তবায়ন নিয়েও নানা দ্বিধা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরোপ করা মামলা প্রত্যাহারের শর্ত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে গত ২৯ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ও অন্যান্য নীতিসহায়তা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে আগে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিট পিটিশনসহ সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আবেদনকারীকে হলফনামার মাধ্যমে ঘোষণা দিতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার কোনো মামলা অসম্পন্ন নেই।

উদ্যোক্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন করে যুক্ত করা মামলা প্রত্যাহারের শর্তের কারণে পুরো প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতিসহায়তার বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতারা মামলা প্রত্যাহার করে আবেদন করে শেষ পর্যন্ত প্রণোদনা বা নীতিসহায়তা না পেলে বিপদে পড়বেন। তখন ভুক্তভোগী গ্রাহকের হাতে কোনো রক্ষাকবচ থাকবে না।

অবশ্য ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, একদিকে মামলা, অন্যদিকে নীতিসহায়তার আবেদন—দুটি একসঙ্গে চলতে পারে না। নীতিসহায়তা পেতে হলে গ্রাহকদের অবশ্যই মামলা প্রত্যাহার করা উচিত। এতে আদালতে মামলাজট কমবে। আর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণও কমে আসবে।

এ বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এ মুহূর্তে পলিসি আছে, কাস্টমার নাই। নীতিসহায়তার ক্ষেত্রে এমনিতেই গ্রাহক কম থাকে। এ কারণে বাস্তবায়নের হারও কম। গ্রাহক একদিকে মামলা চালাবে, অন্যদিকে নীতিসহায়তার আবেদন করবে—দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ধাপে যাচ্ছে।’

প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতিসহায়তা বাস্তবায়নের গতি কিছুটা ধীর বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির বিশেষ পরিস্থিতির বিচারেই প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে। এ কারণে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে কৃষিসহ গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণে যে প্যাকেজগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের গতি ভালো। আমরা তফসিলি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছি।’

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এক্সিট পলিসিসহ বিশেষ পুনঃতফসিলের যে নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে, সেগুলো বাধ্যতামূলক নয়। ব্যাংক ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতেই এ নীতিসহায়তার বাস্তবায়ন হবে। এখন ব্যাংকের বিরুদ্ধে গ্রাহকের মামলা রেখে নীতিসহায়তার বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে সমঝোতার মানসিকতায় এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি পাবে।’

দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী থাকা এ খাতে ঋণের প্রবাহও এখন ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। যদিও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি সত্ত্বেও এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসরকারি খাতে ঋণ খরার প্রভাবে দেশের জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাতও কমতে শুরু করেছে। তিন বছর আগেও ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে এ অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে কমে সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি-বিনিয়োগ অনুপাত ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি-বেসরকারি বিনিয়োগ অনুপাত ছিল ২৪ দশমকি ১৮ শতাংশ। গত অর্থবছর শেষে এ অনুপাত মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে তুলে ধরা হয়।

অর্থনীতিতে বিরাজমান এ স্থবিরতা কাটিয়ে তুলতে গত ২৩ মে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ওইদিন জানান, এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা হবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, যা আসবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ঘোষিত এ ১৫ প্রণোদনা প্যাকেজের বিস্তারিত নীতিমালা গত দুই মাসে প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে খেলাপি ঋণ কমাতে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক্সিট পলিসি ঘোষণা করা হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যাংক ঋণের ওপর আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে আগের কঠোর শর্ত শিথিল করা হয়েছিল।

এরপর গত ২৯ জুলাই এসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঘোষিত কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ কিংবা অন্য কোনো নীতিসহায়তা পেতে হলে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিট পিটিশনসহ সব ধরনের মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে হলফনামার মাধ্যমে ঘোষণা দিতে হবে যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার কোনো মামলা অসম্পন্ন নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া এ নতুন শর্ত নিয়ে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

নতুন করে আরোপিত এ শর্তের বিষয়ে গভর্নরের কাছে চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। এ বিষয়ে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরোপিত নতুন শর্তটি নিয়ে আমাদের সদস্যরা উদ্বিগ্ন। কারণ মামলা প্রত্যাহারের পর নীতিসহায়তা না পেলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা খেলাপি হয়ে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে তার কোনো সুরক্ষাকবচ থাকছে না।’

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘প্রণোদনা ও নীতিসহায়তার আবেদন এবং মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সমান্তরাল হতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদে নীতিসহায়তার ফাইল অনুমোদন পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে মামলা প্রত্যাহারের কপি জমা দেয়ার শর্ত দেয়া যেতে পারে।’

আরও